রবীন্দ্রনাথ নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অসীম শক্তি, এক অজানা বিষ্ময়।
বাঙালির প্রাণ প্রিয় রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আমরা সকলেই অল্প বিস্তর জানি।
তিনি একাধারে ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক অন্যদিকে তেমনি
ছিলেন ভ্রমণপিপাসু, মানবদরদী, চিত্রকর, সুরকার প্রভৃতি। আজ এখানে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের কিছু অজানা বিষয় তুলে ধরলাম।
-
ভ্রমণপিপাসু রবীন্দ্রনাথ – দেশের গর্ব রবীন্দ্রনাথ
ছিলেন ভ্রমণপিপাসু। তিনি সৃষ্টির খোঁজে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য
প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। তাঁর ভ্রমণের হাতেখড়ি হয় ১২ বছর বয়সে তার
পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে হিমালয় যাত্রার মাধ্যমে। এরপর তিনি
মাত্র ১৭ বছর বয়সে পাড়ি দেন ইংল্যান্ড। পরে তিনি পাঁচটি মহাদেশের ৩৩
টিরও বেশি দেশে ভ্রমন করেন। তার মধ্যে জাপান ও আমেরিকা গিয়েছেন তিন বার
করে। এই ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ফসল তাঁর অসাধারণ কিছু ভ্রমণ সাহিত্য – 'ইউরোপ
প্রবাসীর পত্র', 'রাশিয়ার চিঠি', 'যাত্রী', 'জাপানি যাত্রী', 'জাভা
যাত্রীর পত্র' প্রভৃতি। এই ভ্রমণ পিপাসা তাঁকে বিশ্বমানবীর সাথে একাত্ম
করেছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
-
চিকিৎসক রবীন্দ্রনাথ – চিকিৎসা বিষয়েও রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের কৌতূহল কম ছিলনা। তিনি ডাঃ জগত রায়ের বই পড়ে উৎসাহিত হয়ে নিজ
চেষ্টায় ও বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক বন্ধু ডাঃ প্রতাপচন্দ্র মজুমদার ও
ডি. এন. রায়ের পরামর্শে শান্তিনিকেতনে নিজের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা
কেন্দ্র থেকে রোগীদের সেবা করতেন এবং শিলাইদহের জমিদারি প্রজাদের রোগ
নিরাময়েও সাহায্য করতেন। সাধারণ জ্বর, সর্দি, কাশি ছাড়াও জটিল রোগের
চিকিৎসায়ও তিনি পারদর্শী ছিলেন। এমনকি রানী মহলানবিশের টাইফয়েড জ্বরও
তার পরামর্শে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় সেরে যায়।
-
সুরকার রবীন্দ্রনাথ – আজও কোনো উৎসব অনুষ্ঠান রবীন্দ্র
সংগীত ছাড়া অসম্পূর্ণ। এই অসামান্য প্রতিভাবান গীতিকার রবীন্দ্রনাথ
প্রায় ২০০০ এরও বেশি গান রচনা করেছেন এবং নিজে সুরারোপ করেছেন। তার
গানের অধিকাংশই সংকলিত আছে 'গীতবিতান' এ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর
গানগুলির স্বরলিপিও তৈরি করেছিলেন যাতে গানগুলির সুর অপরিবর্তিত থাকে।
একক সংগীত ছাড়াও তিনি গানের মাধ্যমে গল্প বলার ধারাকে পূর্ণাঙ্গ ও
আধুনিক রুপ দিয়েছেন। তাঁর রচিত অত্যন্ত জনপ্রিয় গীতিনাট্য
'চিত্রাঙ্গদা'। এছাড়াও 'মায়ার খেলা', 'তাসের দেশ', 'রক্তকরবী'
উল্লেখযোগ্য।
-
গায়ক রবীন্দ্রনাথ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্ঠ আজও
আমাদের মুগ্ধ করে। তার কন্ঠে গাওয়া গানের সম্ভার খুব বেশি না হলেও তার
গাওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু গান হল 'তবু মনে রেখো', 'আমার পরান লয়ে', 'এসো
এসো ফিরে এসো' প্রভৃতি। যার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। জাতীয় স্তোত্র 'জন
গণ মন' গানটি 1911 সালে জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতার অধিবেশনে তিনি
প্রথমবারের মতো গিয়েছিলেন।
-
চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ – রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী
প্রতিভার এক বিস্ময়কর দিক হলো তার চিত্রকর্ম। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই
জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি পুরোদস্তুর চিত্রশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
তার চিত্রশিল্পের সূচনাটি ছিল বেশ আকর্ষণীয়। পান্ডুলিপির কাটাকুটি থেকে
জন্ম নেওয়া নানা পাখি, জীব, মানুষের প্রতিকৃতি ছিল তার প্রথম দিকের
শিল্প। পরে বহু ছবি এঁকেছেন এবং তা রং করেছেন নিজ হাতে। ১৯৩০ সালে
প্যারিসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির প্রথম প্রদর্শনী হলে ইউরোপীয় শিল্প
সমালোচকরাও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন।
-: সুন্দরবনে রবীন্দ্রনাথ :-
-
হ্যামিলটন সাহেবের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩২ সালে সুন্দরবন
ভ্রমণে যান। তিনি যে সুন্দরবন দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তা তাঁর পরবর্তী
সাহিত্যে অরণ্যের বর্ণনার মাধ্যমে উঠে এসেছে। গোসাবায় হ্যামিল্টন
সাহেবের গ্রাম উন্নয়ন ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেন তিনি এবং কৃষি সমিতি
নির্মাণ প্রসঙ্গে আলোচনা করেন। অনেকে মনে করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই এই
অঞ্চলের নামকরণ করেন 'গোসাবা'। যা গরু, সাপ ও বাঘের প্রতীকী সংমিশ্রণ।
-
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য বেকন বাংলো যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুদিন বাস করেছিলেন, তা আজ বিশেষ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
-
এই সুন্দরবন ভ্রমণ কালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশেষ ট্রেনে কলকাতা থেকে
ক্যানিং পৌঁছেছিলেন। ফেরার পথে ক্যানিং স্টেশনে অপেক্ষমান রবীন্দ্রনাথ যে
চেয়ার বা আরামকেদারায় বসে অপেক্ষা করেছিলেন তা আজও স্মৃতি হিসেবে পূর্ব
রেল বিশেষভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। এবং পরে তা প্রদর্শনের
পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাবীন্দ্রিক জ্ঞানের পরিধি এতই বিপুল যে তিনি চিরকালই আমাদের কাছে অত্যন্ত
প্রাসঙ্গিক ও চেনার মাঝে চির অচেনা ও জানার মাঝে চির অজানা থেকে যাবেন।।
~ সঞ্চিতা রক্ষিত
চতুর্থ সেমিস্টার, ইতিহাস বিভাগ