সেদিন ছিল ভাদ্র মাসের এক কালবৈশাখী রাত। আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা, আর সাথে তীব্র বাতাস। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন দাপাদাপি করছে। গ্রামের এক পুরনো বাড়ির কার্নিশে খড়কুটো দিয়ে চড়ুই পাখি দম্পতি একটি ছোট্ট বাসা বেঁধেছিল। সেই বাসায় ছিল একটি ছোট্ট প্রাণ, তাদের বাচ্চা। বাতাসের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে বাসাটি নড়বড়ে হয়ে ওঠে। হঠাৎ এক প্রচণ্ড দমকা হাওয়ায় বাসাটি ভেঙে যায়। বাচ্চা চড়ুইটি সোজা নিচে বারান্দার মেঝেতে পড়ে যায়। ওড়ার ডানা তখনও পুরোপুরি গজায়নি, তাই সে অসহায়ভাবে বৃষ্টির ছাঁটে ভিজতে থাকে।
সন্ধ্যায় পড়তে বসেছি। ঝড়-বৃষ্টির শব্দে আমার পড়ার টেবিলে মন বসছিল না। হঠাৎ কার্নিশের পাশ থেকে ক্ষীণ চিঁ চিঁ ডাক শুনতে পেলাম। তড়িঘড়ি জানালার পর্দা সরিয়ে টর্চ জ্বালাতেই দেখি, বারান্দার কোণে একটি ছোট্ট পাখি ভিজে জবজবে হয়ে কাঁপছে। দেখে খুব মায়া হলো। দৌড়ে গিয়ে একটি তোয়ালে এনে চড়ুইয়ের বাচ্চাটিকে আলতো করে তুলে নিই। বাচ্চাটি এতটাই ক্লান্ত ছিল যে, সে আর ডানা ঝাপটাচ্ছিল না, শুধু করুণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
পাখিটিকে আমার পড়ার ঘরের টেবিলে নিয়ে আসি। একটা শুকনো কাপড়ে মুড়িয়ে হালকা ওমে রাখি। খুদে চড়ুই একটু স্বাচ্ছন্দ বোধ করল। তারপর ড্রপার দিয়ে সামান্য কুসুম গরম একটু জল খাইয়ে দিলাম। সারারাত পাখিটির পাশেই বসে রইলাম আর ব্যকুল হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।
সকালবেলা ঝড় থামলে পাখিটি একটু সুস্থ হয়ে ওঠে। বারান্দার ছাদের পাশে একটি ছোট্ট ঝুড়িতে পুরোনো খড়কুটো দিয়ে একটা অস্থায়ী বাসা তৈরি করে দিই তাদের এবং বাচ্চাটিকে সেখানে রেখে দিই। কিছুক্ষণ পর মা চড়ুইটি তার ছানাকে খুঁজে পায় এবং খাবার নিয়ে আসে।
কয়েকদিন পর, যখন বাচ্চা চড়ুইটির ডানা শক্ত হয়, সে তার মায়ের সাথে উড়ে যায়। আমার মনটা খুব খারাপ হয়েগেল। কিন্তু দেখি নিয়ম করে প্রতিদিন বিকেলে আমার বারান্দার কার্নিশে এসে কূজন করে যেন ধন্যবাদ জানিয়ে যায়। বুঝলাম সেই ছোট্ট প্রাণটি সেই রাতে করা আমার উপকার ভুলে যায়নি। সে আজও আমার প্রতি তার কৃতজ্ঞতা দেখিয়ে যায় তার নিজের মতো করে, যা ছিল আমার কল্পনাতীত।
রিম্পা সাধুখাঁ