রবীন্দ্রনাথ: যুদ্ধের পৃথিবীতে এক অনন্ত শান্তির ডাক

বিশ্ব আজ অস্থির। চারিদিকে যুদ্ধের আগুন, মানুষের কান্না, ভাঙা ঘর আর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন—আজকের পৃথিবী এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি, অন্যদিকে যুদ্ধ, হিংসা ও ধ্বংসের করাল ছায়া! বিভিন্ন দেশের সংঘর্ষে প্রতিদিন অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। এমন এক সময় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—"এই পৃথিবী কি সত্যিই শান্তির পথে ফিরতে পারবে?"

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দিকে, যিনি কেবল একজন কবি নন, বরং এক বিশ্বমানবতার কণ্ঠস্বর! রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এমন একজন চিন্তাবিদ, যিনি মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, ঐক্যের বাণী প্রচার করেছেন। তিনি কখনোই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের পরিচয় কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—মানুষ সর্বপ্রথম একজন "বিশ্বমানব"! তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যখন নিজেকে কেবল একটি দেশের নাগরিক হিসেবে দেখে, তখন সে অন্য মানুষকে পর করে ফেলে। আর এই "পর" ভাবনাই যুদ্ধের মূল কারণ! তাঁর মতে, জাতীয় অহংকারই মানুষের মধ্যে বিভেদ ও সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। আজকের বিশ্ব পরিস্থিতিতে তাঁর এই বক্তব্য যেন আরও সত্য হয়ে উঠেছে। যদি তিনি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো বলতেন—"মানুষ তার পরিচয়ের সীমানা ভুলে গিয়ে আবার মানুষ হয়ে উঠুক।"

তাঁর কবিতা "Where the mind is without fear"–এ তিনি এমন এক জগতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে—"চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।" এই স্বপ্ন কেবল একটি কবিতার পংক্তি নয়, বরং একটি আদর্শ সমাজের প্রতিচ্ছবি। আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে এই স্বপ্ন যেন এক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের অন্ধকারের মধ্যেও পথ দেখায়।

যুদ্ধের ধোঁয়ায় যখন আকাশ ঢেকে যায়, মানুষের হৃদয় যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে বিভেদের ভারে, তখন এক অদৃশ্য সুর আমাদের ছুঁয়ে যায়—সে সুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তাঁর গানে যেন লুকিয়ে আছে এক অনন্ত মানবতার আহ্বান, যেখানে মানুষ নিজেকে ছাপিয়ে অন্যের কাছে পৌঁছাতে শেখে। “প্রাণ ভরি’য়ে তৃষা হরিয়ে / মোরে আরো, আরো, আরো দাও প্রাণ”— এই আকাঙ্ক্ষা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি এক বৃহত্তর মানবমনের বিস্তার। যখন হৃদয় প্রসারিত হয়, তখনই মানুষ সংকীর্ণতার গণ্ডি পেরিয়ে অপরকে আপন করে নিতে পারে। আর এই আপন করে নেওয়ার মধ্যেই জন্ম নেয় শান্তি।

তাঁর সুরে আবার ধ্বনিত হয়— “সবারে করি আহ্বান, এসো উৎসুক চিত্ত, আনন্দিত প্রাণ।” এই ডাকে লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য। যতদিন মানুষ নিজের স্বার্থের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকবে, ততদিন যুদ্ধ থামবে মোহ। কিন্তু যখন মানুষ নিজেকে বিলিয়ে দিতে শিখবে, তখনই পৃথিবী নতুন করে শান্তির পথ খুঁজে পাবে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত শান্তি বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না—তা মানুষের অন্তরে গড়ে তুলতে হয়। তাই তিনি শিক্ষার মাধ্যমে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতার বীজ বপন করতে চেয়েছিলেন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা তারই বাস্তব রূপ, যেখানে বিশ্বের নানা সংস্কৃতি একত্রে মিলিত হয়ে শান্তির সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।

শেষ পর্যন্ত এসে বোঝা যায়, শান্তি বাইরে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না—তা জন্ম নেয় মানুষের অন্তরে, তার ভাবনায় ও তার আচরণে। যখন মানুষ নিজেকে অতিক্রম করে অন্যকে আপন করে নিতে শেখে, যখন হৃদয় সংকীর্ণতা ছেড়ে উদারতার দিকে এগিয়ে যায়, তখনই ধীরে ধীরে সংঘাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে শান্তির আলো ফুটে ওঠে। এই বিশ্বাসই আমাদের অন্তরে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখে—যে, যতই অশান্তি ও বিভেদ পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করুক না কেন, মানবতার শক্তিতেই একদিন শান্তির পথ নির্মিত হবে।

অতএব, যুদ্ধের এই অন্ধকার সময়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায় এবং অন্তরে আশার সঞ্চার করে। তাঁর আদর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, মানুষের হৃদয়ের মমতা, সহানুভূতি ও মানবিকতায় নিহিত। আমরা যদি তাঁর মতো করে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখি, যদি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতাকে জীবনের ভিত্তি করি, তবে নিঃসন্দেহে একদিন এই অশান্ত পৃথিবী সমস্ত অন্ধকার পেরিয়ে শান্তির আলোর পথে এগিয়ে যাবে—আর সেই আলোই হবে এক সত্যিকারের মানবিক বিশ্বের সূচনা।

~ অঙ্কিতা মাইতি
Department of Mathematics, 4th sem

← প্রথম পাতায় ফিরুন