“আজও তিনি আছেন প্রকৃতির কবি, বিজ্ঞানের অন্বেষী”হয়ে …
২৫শে বৈশাখ এলেই আমরা স্মরণ করি কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কে —
তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক সুরকার, শিল্পী । কিন্তু এই বহুমুখী প্রতিভার আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরেকটি গভীর সত্তা —যা ছিল একজন কৌতূহলী বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের ।
প্রকৃতির প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা শুধু তাঁর কাব্যের অলংকার ছিল না, ছিল এক গভীর পর্যবেক্ষণের ফল। গাছ, পাতা, ফুল ফল,
—এসব তাঁর কাছে নিছক সৌন্দর্যের বস্তু নয়, ছিল জীবনের এক চলমান রহস্য। আজকের দিনে উদ্ভিদবিদ্যার ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে আমরা বুঝতে পারি, তাঁর এই পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানমনস্কতার বহিঃপ্রকাশ ।
শান্তিনিকেতনের পরিবেশ গড়ে তোলার সময় তিনি প্রকৃতিকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করেছিলেন। খোলা আকাশের নিচে পাঠদান, ঋতুর পরিবর্তনের শিক্ষা ও তার সঙ্গে সুরের মেলবন্ধনের মধ্যে ছিল এক গভীর বৈজ্ঞানিক চিন্তা। সে চিন্তা এমন চিন্তা, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি একসাথে শেখে এবং বেড়ে ওঠে।
জগদীশচন্দ্র বোস-এর সঙ্গে কবি গুরুর গভীর বন্ধুত্বও তাঁর সেই বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয়। উদ্ভিদের জীবন ও অনুভূতি নিয়ে বোসের গবেষণায় তিনি আগ্রহী ছিলেন এবং সেই ভাবনা তাঁর লেখাতেও প্রতিফলিত হয়েছে —যেখানে তিনি গাছপালার জীবন্ত সত্তা অনুভব করেছেন।
তাঁর রচনা “বিশ্বপরিচয়” শুধু সাহিত্য নয়, বিজ্ঞানের সহজ ভাষায় বিশ্বের এক অনন্য ব্যাখ্যা। সেখানে তিনি মহাবিশ্ব, প্রকৃতি ও জীবনের সম্পর্ককে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা পাঠককে ভাবতে শেখায় — জ্ঞান শুধু তথ্য নয়, তা হলো অন্তরের অনুভূতি।
এইভাবেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজ ও আমাদের শেখান— ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞান’ বিপরীতধর্মী নয়, বরং একই সত্যের দুই ভিন্ন প্রকাশ। তাঁর মতে প্রতিটি পাতার দোলায়, প্রতিটি ফুলের ফুটনে লুকিয়ে থাকে এক অনন্ত প্রশ্ন, আর সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হলো জ্ঞান।
তাই আজও ২৫ শে বৈশাখ এলেই মনে হয়, সময় যেন একটু থেমে যায়। চারপাশে হাওয়ার মধ্যে ভেসে আসে এক অদৃশ্য সুর —যেন কেউ নীরবে বলে ওঠেন, —
“আমি আজ ও আছি, থাকবো, তোমাদের সকলের মাঝে প্রকৃতি হয়ে, সুর হয়ে, জ্ঞান পিপাসু প্রকৃতি বিজ্ঞানী হয়ে।’’