রবীন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী পরিচালিত ওয়েবজিন

A+ A A-

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি

কলমে: শ্রেয়সী সামন্ত

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি 

 

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল জয়ী হিসেবে বন্দিত গোটা বিশ্বে, তবে বাঙালির কাছে তিনি রবি ঠাকুর। তাই ক্যালেন্ডারে শনিবার হলেও আজ রবিবার। আজ ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মদিন। সেই উপলক্ষে রাজ্য জুড়ে আজ উৎসবের আমেজ। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেও সেই আমেজ। কারণ এখানেই যে বিশ্বকবির জন্ম। 

তবে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ নীলমণি ঠাকুরের কথা। তিনি তৎকালীন উত্তর কলকাতার চিৎপুর রোডের পূর্ব দিকে মেছোবাজারে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে একটি বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। সেদিনের মেছোবাজার এখন মেছুয়া নামে পরিচিত। একসময়ের বড় মাছ বাজার এখন কলকাতার সবচেয়ে বড় পাইকারি ফলের বাজার। জোড়াসাঁকো নামটি এসেছে সম্ভবত নিকটবর্তী দুটি জোড়া শঙ্কর বা শিব মন্দির অথবা একটি জোড়া বাঁশের সেতু থেকে। বর্তমানে এখানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাদুঘর অবস্থিত। 

এই প্রাসাদোপম লাল ইটের অট্টালিকাটি ৩৫ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এখানে রয়েছে ঠাকুর পরিবারের ব্যবহৃত এবং ঐতিহাসিক সামগ্রী। এই ঠাকুরবাড়ির ফটক একটাই কিন্তু ঘরে ঘরে প্রতিভার মিছিল। দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী দেবী, ইন্দিরা দেবী, দিনেন্দ্র, সৌমেন্দ্র প্রমূখ বাংলার সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট নাম। আর রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির নক্ষত্র মন্ডল এর সূর্য। 

জোড়াসাঁকোর এই বাড়িতেই কবির সঙ্গে থাকতেন কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী। রয়েছে কবিপত্নি ব্যবহৃত দুটি ঘর। সেখানে রাখা আছে তার ব্যবহৃত আসবাব পত্র, পালঙ্ক, পানের ডিবা ও টুকিটাকি গহনা। রয়েছে বেতের চেয়ার টেবিল যেগুলো ব্যবহার করতেন ঠাকুর পরিবারে সদস্যরা। পরের ঘরটিতেই রাখা কবির ব্যবহৃত পোশাক ও নানা বয়সের ছবি। সেখানে একটি স্থিরচিত্র আছে যেখানে কবিগুরু শিক্ষক হিসেবে শান্তিনিকেতনে ক্লাস নিচ্ছেন। 

যারা রবীন্দ্রনাথের জীবন চর্চা করেন তারা দক্ষিণের বারান্দার কথা নিশ্চয়ই জানবেন, যা বয়ে চলেছে শুধু স্মৃতি। এছাড়াও চোখে পড়বে দোতলার আঁতুর ঘর ও বংশপঞ্জি কক্ষ। এই বংশপঞ্জি কক্ষে ঠাকুর পরিবারের বংশপঞ্জি, সদস্যদের তৈলচিত্র, ও কিছু বইয়ের প্রথম সংস্করণ রয়েছে। 

বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকেই শুরু জাদুঘর। প্রধান দর্শনীয় ঘরের নাম 'রবীন্দ্র প্রয়াণ কক্ষ'। রবীন্দ্রভারতী জাদুঘরে ২০৭১ টি বই, ৭৭০ টি দিনলিপি, ১৬ টি চিত্রকর্ম, ৩২৯৭ টি আলোকচিত্র, ২৭ টি হস্তশিল্প ও ভাস্কর্য এবং তিনটি আসবাবপত্রের সংরক্ষণ আছে। এখানে কবির আঁকা চল্লিশটি মূল চিত্রকর্ম এবং তার নোটবুকগুলি প্রদর্শিত হয়েছে। যেগুলি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঠাকুর পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিল।

মহর্ষি ভবনের ভিতরে তিনটি গ্যালারি আছে। প্রথম গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কর্ম তুলে ধরা হয়েছে। বাকি দুটিতে রাজকুমার, দারকানাথ, অবনীন্দ্রনাথ, দেবেন্দ্রনাথের মতো সদস্যদের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

শিল্প কলার দুটি গ্যালারিতে কবির সদস্যদের প্রতিকৃতি এবং অবনীন্দ্রনাথের প্রবর্তিত 'বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট' এর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। এছাড়াও জাপান, চীন, আমেরিকা ও হাঙ্গেরির গ্যালারিতে ৭০০ এর বেশি চিত্রকর্মের পাশাপাশি পাণ্ডুলিপি, বহু অন্যান্য পুরাকীর্তি রয়েছে, যা রবি ঠাকুরের আন্তর্জাতিক সংযোগের উপর আলোকপাত করে। জাদুঘরটিতে প্রদর্শনের জন্য তিন হাজারের বেশি ছবির সংগ্রহ রয়েছে। 

অট্টালিকার পিছনের উঠোনে রাখা আছে কবির হাম্বার গাড়িটি।

আপনি যখন ভবন ঘুরে দেখবেন তখন প্রতিটি ঘর থেকে কানে ভেসে আসবে রবীন্দ্র সংগীত। ঠাকুরবাড়ি ঘুরতে ঘুরতে তার ইতিহাস ও স্মৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে কখন যেন আপনার মনে হবে আপনিও ঠাকুর বাড়ির একজন হয়ে উঠেছেন। 

 

নিবন্ধ তালিকায় ফিরে যান
× Enlarged Image