রবীন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী পরিচালিত ওয়েবজিন

A+ A A-

রবীন্দ্রনাথের ‘সাধনা’ ও বর্তমান সমাজ: মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিবর্তন

কলমে: শিপ্রা মেটে

রবীন্দ্রনাথের ‘সাধনা’ ও বর্তমান সমাজ: মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিবর্তন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সাধনা' (Sadhana): The Realisation of Life) কোনো নিছক তাত্ত্বিক ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এটি মানুষের আত্মিক জাগরণ এবং বিশ্বের সাথে তার নিবিড় সম্পর্কের এক দার্শনিক দলিল। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত এই প্রবন্ধ সংকলনে তিনি উপনিষদের আলোকে মানুষের সার্থকতা খুঁজেছেন। আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যন্ত্রনির্ভরতা এবং চূড়ান্ত ভোগবাদের যুগে বাস করছি, তখন 'সাধনা' গ্রন্থে বর্ণিত মানুষের সম্পর্কের আদর্শগুলো এক নতুন প্রাসঙ্গিকতা দাবি করে।

১. অহং বনাম আত্মা: বিচ্ছিন্নতার বর্তমান চিত্র

রবীন্দ্রনাথ 'সাধনা'য় বারবার বলেছেন যে, মানুষ যখন কেবল নিজের ‘অহং’ (Ego) বা ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমান সমাজে এই বিচ্ছিন্নতা চরম আকার ধারণ করেছে।

রবীন্দ্রনাথের মতে, সত্যকারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে আত্মার মিলনে। অথচ আজকের প্রতিযোগিতামূলক সমাজ মানুষকে একে অপরের প্রতিযোগী হিসেবে দেখতে শিখিয়েছে। ফলে সম্পর্কের ভিত্তি এখন আর ‘ত্যাগ’ বা ‘সহমর্মিতা’ নয়, বরং ‘প্রয়োজন’ ও ‘উপযোগিতা’।

২. ভূমার স্বাদ ও বস্তুবাদী সমাজ

'সাধনা'র একটি অন্যতম মূল কথা হলো— "ভূমা বৈ সুখম, নাল্পে সুখমস্তি" (যা বিশাল তাতেই সুখ, অল্পে সুখ নেই)। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, মানুষের সম্পর্কের সার্থকতা কেবল বৈষয়িক আদান-প্রদানে নয়, বরং একে অপরের ভেতর অসীমকে অনুভব করার মধ্যে।

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আমরা ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়া এবং বস্তুগত প্রাপ্তিকে জীবনের লক্ষ্য করে তুলেছি। এর ফলে মানুষের মধ্যকার সম্পর্কে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে তার পদমর্যাদা বা সম্পদ দিয়ে বিচার করছি। রবীন্দ্রনাথ সতর্ক করেছিলেন যে, প্রকৃতির সাথে এবং মানুষের সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে মানুষ কখনোই পূর্ণতা পেতে পারে না। 

৩. কর্ম ও প্রেম: সম্পর্কের সেতুবন্ধন

রবীন্দ্রনাথ 'সাধনা' গ্রন্থে ‘কর্মযোগ’ ও ‘প্রেম’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, নিঃস্বার্থ সেবা বা কর্মের মাধ্যমেই মানুষের সাথে মানুষের আধ্যাত্মিক যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

রবীন্দ্রদর্শনে ‘কর্ম’ হলো আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। যখন আমরা অন্যের মঙ্গলের জন্য কাজ করি, তখন সম্পর্কের মাঝে আনন্দ অনুভূত হয়। বর্তমানের স্বার্থপরতার সংস্কৃতিতে ‘প্রেম’ বা ‘ভালোবাসা’ শব্দটি অনেক সময় শারীরিক বা আবেগীয় উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রেম হলো— "নিঃস্বার্থভাবে অন্যের অস্তিত্বকে নিজের মধ্যে অনুভব করা।"

৪. সমাধান ও উত্তরণ

রবীন্দ্রনাথের ‘সাধনা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের চরম লক্ষ্য ‘হওয়া’ (Being), কেবল ‘পাওয়া’ (Having) নয়। বর্তমান সমাজের এই যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তির উপায় হলো সম্পর্কের গভীরে প্রবেশ করা।

• সহমর্মিতা বৃদ্ধি: অন্যের দুঃখকে নিজের করে দেখা।

• প্রকৃতির সাথে সংযোগ: মানুষ ও প্রকৃতিকে বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসেবে না দেখে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।

• সীমার মাঝে অসীম: প্রতিদিনের তুচ্ছ সম্পর্কের মাঝেও মহৎ কিছু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের ‘সাধনা’ গ্রন্থটি বর্তমান সমাজের জন্য একটি দর্পণস্বরূপ। আধুনিক সভ্যতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আমরা যখন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি, তখন রবীন্দ্রনাথ আমাদের শেখান যে, অন্যের মধ্যেই আসলে নিজের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক যদি কেবল যন্ত্র বা প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে, তবে সমাজ আত্মাহীন হয়ে পড়বে। তাই ‘সাধনা’র শিক্ষা অনুসরণে আমাদের উচিত হৃদয়ের প্রসার ঘটানো এবং প্রেম ও ত্যাগের মাধ্যমে একে অপরের সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করা। তবেই বর্তমান সমাজ এই নৈতিক ও আত্মিক সংকট থেকে মুক্তি পাবে।

 

 

নিবন্ধ তালিকায় ফিরে যান
× Enlarged Image